০৮:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা 

  • আপডেট: ১১:০০:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১৮০২০

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

 

মোঃখলিলুর রহমান খলিল বিশেষ প্রতিনিধি ঃগুরুতর অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

খালেদা জিয়া ( ১৯৪৫ – ২০২৫) ছিলেন একজন বাংলাদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি ১৯৯১-১৯৯৬ দুই মেয়াদে এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন ও দলনেত্রী ছিলেন, যা তার স্বামী জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএনপির আজীবন চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রভাব তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।

 

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন।১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই মূলত বিএনপির পূর্ণ বিকাশ হয়।

 

নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন

১৯৮৩ সালের বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। একই সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ হয়। বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ এর সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন। একই সময় তার নেতৃত্বে সাত দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন পনেরো দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচির সূত্রপাত করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া “এরশাদ হটাও” শীর্ষক এক দফার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এর ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। তারপর পুনরায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের উপক্রম হয়। অবশেষে দীর্ঘ আট বছর অবিরাম, নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য রূপে দলে যোগ দেবার পর থেকে মোট পাঁচ বার তিনি আটক হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর আটক হন।

 

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (১ সেপ্টেম্বর ২০০৭) দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন।প্রায় এক বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন।২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পান।

 

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলা (জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা) দেখিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।প্রথমে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড কারাগারে বন্দি ছিলেন, পরে স্বাস্থ্যগত কারণে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে রাখা হয়।প্রায় দীর্ঘ ২ বছরেরও বেশি সময় তিনি কার্যত কারাগারে ছিলেন। ২৫ মার্চ ২০২০-এ সরকার শর্তসাপেক্ষে তাকে মুক্তি দেয় (কারাগারের সাজা স্থগিত করে বাসায় চিকিৎসার অনুমতি দেয়)। তবে এটিও পুরোপুরি মুক্তি নয়, আইনি শর্তে গৃহবন্দিত্বের মতো অবস্থা ছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত তাকে রাজনৈতিকভাবে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল।

২০১১ সালের ২৪ শে মে নিউ জার্সি স্টেট সিনেটে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ’ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক প্রদান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেট কর্তৃক কোন বিদেশিকে এ ধরনের সম্মান প্রদানের ঘটনা এটাই ছিল প্রথম।

 

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেয় কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) নামের একটি সংগঠন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি উক্ত দাবি করার পাশাপাশি কানাডার এই প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ক্রেস্ট ও সনদপত্র সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়।

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই সঙ্গে আগামীকাল বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন তিনি।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আগামীকাল বুধবার বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলের পাশে তাকে দাফন করা হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার সচিব শফিকুল আলম। একই সঙ্গে জানাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অংশ নেবেন। এছাড়া সরকারের উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা অংশ নেবেন।

 

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘খালেদা জিয়ার জানাজা, দাফন ও আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয় নিয়ে বৈঠক’ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

 

প্রেস সচিব বলেন, কালকে বেগম খালেদা জিয়ার দাফন এবং জানাজা এবং এ পুরো প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া হবে, এ বিষয়ে একটি সামগ্রিক আলোচনা করা হয়েছে। এবং এখানে মূল জোর দেওয়া হয়েছে যে পার্টির সঙ্গে পুরোটা সমন্বয় করে সমস্ত কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে।

 

সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ওনার (খালেদা জিয়া) জানাজা হবে। ওনার লাশ সকালেই এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে জাতীয় সংসদ ভবনে নিয়ে আসা হবে।

 

এ নিয়ে আসার সময় পুরো রাস্তার দুই পাশেই একটা স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট এনসিওর করা হবে। আমরা অ্যাট দ্য সেইম টাইম জানিয়ে দিব- কখন এ লাশবাহী গাড়ি কখন রওনা দেবে। এটাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনারে ওনাকে নিয়ে আসা হবে দক্ষিণ প্লাজায়, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। সেখানে জানাজা হবে।

জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বেগম জিয়াকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে প্রয়াত স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে।

 

জানাজায় নিরাপত্তার স্বার্থে দশ হাজার আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত থাকবে বলে জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা 

আপডেট: ১১:০০:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

 

মোঃখলিলুর রহমান খলিল বিশেষ প্রতিনিধি ঃগুরুতর অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

খালেদা জিয়া ( ১৯৪৫ – ২০২৫) ছিলেন একজন বাংলাদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি ১৯৯১-১৯৯৬ দুই মেয়াদে এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন ও দলনেত্রী ছিলেন, যা তার স্বামী জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএনপির আজীবন চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রভাব তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।

 

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন।১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই মূলত বিএনপির পূর্ণ বিকাশ হয়।

 

নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন

১৯৮৩ সালের বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। একই সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ হয়। বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ এর সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন। একই সময় তার নেতৃত্বে সাত দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন পনেরো দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচির সূত্রপাত করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া “এরশাদ হটাও” শীর্ষক এক দফার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এর ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। তারপর পুনরায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের উপক্রম হয়। অবশেষে দীর্ঘ আট বছর অবিরাম, নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য রূপে দলে যোগ দেবার পর থেকে মোট পাঁচ বার তিনি আটক হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর আটক হন।

 

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (১ সেপ্টেম্বর ২০০৭) দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন।প্রায় এক বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন।২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পান।

 

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলা (জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা) দেখিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।প্রথমে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড কারাগারে বন্দি ছিলেন, পরে স্বাস্থ্যগত কারণে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে রাখা হয়।প্রায় দীর্ঘ ২ বছরেরও বেশি সময় তিনি কার্যত কারাগারে ছিলেন। ২৫ মার্চ ২০২০-এ সরকার শর্তসাপেক্ষে তাকে মুক্তি দেয় (কারাগারের সাজা স্থগিত করে বাসায় চিকিৎসার অনুমতি দেয়)। তবে এটিও পুরোপুরি মুক্তি নয়, আইনি শর্তে গৃহবন্দিত্বের মতো অবস্থা ছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত তাকে রাজনৈতিকভাবে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল।

২০১১ সালের ২৪ শে মে নিউ জার্সি স্টেট সিনেটে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ’ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক প্রদান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেট কর্তৃক কোন বিদেশিকে এ ধরনের সম্মান প্রদানের ঘটনা এটাই ছিল প্রথম।

 

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেয় কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) নামের একটি সংগঠন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি উক্ত দাবি করার পাশাপাশি কানাডার এই প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ক্রেস্ট ও সনদপত্র সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়।

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই সঙ্গে আগামীকাল বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন তিনি।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আগামীকাল বুধবার বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলের পাশে তাকে দাফন করা হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার সচিব শফিকুল আলম। একই সঙ্গে জানাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অংশ নেবেন। এছাড়া সরকারের উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা অংশ নেবেন।

 

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘খালেদা জিয়ার জানাজা, দাফন ও আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয় নিয়ে বৈঠক’ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

 

প্রেস সচিব বলেন, কালকে বেগম খালেদা জিয়ার দাফন এবং জানাজা এবং এ পুরো প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া হবে, এ বিষয়ে একটি সামগ্রিক আলোচনা করা হয়েছে। এবং এখানে মূল জোর দেওয়া হয়েছে যে পার্টির সঙ্গে পুরোটা সমন্বয় করে সমস্ত কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে।

 

সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ওনার (খালেদা জিয়া) জানাজা হবে। ওনার লাশ সকালেই এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে জাতীয় সংসদ ভবনে নিয়ে আসা হবে।

 

এ নিয়ে আসার সময় পুরো রাস্তার দুই পাশেই একটা স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট এনসিওর করা হবে। আমরা অ্যাট দ্য সেইম টাইম জানিয়ে দিব- কখন এ লাশবাহী গাড়ি কখন রওনা দেবে। এটাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনারে ওনাকে নিয়ে আসা হবে দক্ষিণ প্লাজায়, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। সেখানে জানাজা হবে।

জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বেগম জিয়াকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে প্রয়াত স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে।

 

জানাজায় নিরাপত্তার স্বার্থে দশ হাজার আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত থাকবে বলে জানা গেছে।