জাতিসংঘে বেগম খালেদা জিয়ার ‘ফারাক্কা ভাষণ’ ও মেঠো ইঁদুরের ছোটাছুটি:
সেলিম মাহবুবঃ
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম অধিবেশনে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর এ ভাষণে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের ভাষা অনুরণিত হয়। সর্বস্তরের মানুষ এ ভাষণ থেকে হয় নতুনভাবে উজ্জীবিত। আত্মপ্রত্যয় হয় দৃঢ়। আত্মমর্যাদাবোধ, জাতীয় অহমিকা বৃদ্ধি পায় বহুগুণ।
বিশেষ করে ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে বেগম জিয়া বিশ্বসভায় যে দৃঢ় মনোভাব দেখান তা ছোট বড় সকল দেশকেই অবাক করে দেয়। তার এই সত্য উচ্চারণে ভারতীয় প্রতিনিধিরা হতবাক হয়ে পড়েন। উল্লেখ্য, বেগম জিয়া যে জাতিসংঘে এত কঠোর ভাষায় ভারতের সমালোচনা করবেন তা বিএনপি দলীয় নেতা, এমপি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তারাও আঁচ করতে পারেননি।
এমনকি বেগম জিয়া জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে প্রেসব্রিফিং এর সময় তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ রহমানও এ সম্পর্কে কোন পূর্বাভাস দেননি। আলোচ্য ভাষণে বেগম জিয়া যে দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন তা নিয়ে একমাত্র পঞ্চম বাহিনীর সদস্যরা ছাড়া সর্বস্তরের বাংলাদেশি জনগণ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে।
এই ভাষণ সম্পর্কে সাপ্তাহিক সুগন্ধা পত্রিকার ৮ অক্টোবর ১৯৯৩ সংখ্যায় মন্তব্য করা হয়, ... ‘‘গোটা বিশ্বের মানবতাকামী, শান্তিকামী মানুষের সচকিত দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তাঁর এ ভাষণ।
সমস্যা সংকুল বাংলাদেশের ইতিহাসে তার ভাষণ সৃষ্টি করেছে এক তরঙ্গায়িত স্রোতধারা। তিনি সকল জল্পনা—কল্পনা, বিরূপ প্রচারণা, সন্দেহবাদীদের সন্দেহ সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবন—মরণ সমস্যা ফারাক্কা বাঁধের মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশ্ব সভাকে অবহিত করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তুলে ধরেছেন ফারাক্কা বাঁধ কীভাবে বাংলার বার কোটি মানুষের জন্য মরণ ফাঁদের ভয়ালরূপ পরিগ্রহ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ভারতের এই মানবতা ও নীতি বিবর্জিত কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বেগম জিয়া তার ভাষণে জাতির এই জীবন—মরণ সমস্যাকে দ্বিপক্ষীয়তার ঘেরাটোপ থেকে বিশ্ব সভার অঙ্গনে নিয়ে গিয়ে বিশ্ব সভ্যতা ও বিশ্ব বিবেকের দরজায় সজোরে করাঘাত এবং ফারাক্কা বাঁধের ওপর সাহসী কুঠারাঘাত করেছেন। ’’
তবে একইসাথে বেগম জিয়ার এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠার সৃষ্টি হয় এ দেশের জনগণের মাঝে। তারা ভাবতে থাকেন— ভারত কখনোই এজন্য বাংলাদেশকে ক্ষমা করবে না।
এ ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে একজন কলামিস্ট মন্তব্য করেন, “এই দরিদ্র বিষণ্ণ মানচিত্রের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও স্পন্দনের প্রতিনিধিত্বকারী একটি ভাষণ, সেটি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘে দিয়েছেন, গোটা বাংলাদেশে সঞ্চার করেছে দুর্লভ সাহস। আলোড়িত করেছেন বিশ্বকে। বাংলাদেশের মানুষ উৎফুল্ল হয়েছে, আশান্বিত হয়েছে, উদ্দীপ্ত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে হয়েছে উৎকণ্ঠিত।
এই উৎকণ্ঠা হচ্ছে সাহসের সঙ্গে সত্য বলার বিপদ সম্পর্কে। কারণ, আমাদের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই গ্রহের শক্তিমানেরা আর যাই সহ্য করুক, একজন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদীর স্বাধীন অহংবোধকে সহ্য করতে চায় না।
সত্য উচ্চারণের পর হাজার হাজার ধারাল সিং তেড়ে আসে। রক্তচক্ষু মেলে ভয় দেখায়। লাখ লাখ ব্যারেল, কোটি কোটি বুলেট তাক করে হুমকি দেয় মাথা নোয়ানোর জন্য, স্বাক্ষর করতে হয় কখনো কখনো মৃত্যু—পরোয়ানায়ও। ইতিহাস হয়তো তাদের জন্য বরাদ্দ করে অমরত্ব। কিন্তু তবুও এই ঝুঁকি ক’জন নিতে পারে?” [ আহমদ মুসা, কালের সাহসী বাক্যগুলোর একটি প্রেরণা সঞ্চারী ভাষণ, দৈনিক দিনকাল ৭১/১০/৯৩]।
এদিকে বেগম জিয়ার ‘ফারাক্কা ভাষণ’ দেশজ দৃষ্টিকোণ থেকে উৎসারিত হলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে তদানীন্তন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়। এই দলের নেতৃবৃন্দের মন্তব্য পর্যালোচনা করে যে কারোরই মনে হতে পারে তারা বেগম জিয়ার ভারতকে অভিযুক্ত করে ভাষণদানে মোটেও খুশি হতে পারেননি।
এই ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মন্তব্য উল্লেখ করলে দেখা যায়, ফারাক্কা ভাষণ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আ’লীগ সাধারণ সম্পাদক জনাব জিল্লুর রহমান ৬ অক্টোবর ’৯৩ তারিখে কিশোরগঞ্জের এক জনসভায় বলেন, “জাতিসংঘে ফারাক্কা সমস্যার কথা বলে ভারত থেকে পানি আনা যাবে না।
এমনকি বাংলাদেশ যদি মরুভূমিতে পরিণত হয় তবুও ভারত পানি দেবে না। কাজেই জাতিসংঘে ফারাক্কার কথা বলে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুধু ভুলই করেননি, জনগণকে ধোঁকা দিয়েছেন।...”
এছাড়া ১৭ অক্টোবর ’৯৩ তারিখে আব্দুল মালেক উকিল স্মরণসভায় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন, “......আওয়ামী লীগ কিছু জানে না, তিনি ভাষণ দিয়ে এলেন জাতিসংঘে।”
অন্যদিকে বেগম জিয়া যখন জাতিসংঘে ফারাক্কা ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক, মহিউদ্দিন আহমদ ও রহমত আলী এক রহস্যময় কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করছিলেন। আব্দুর রাজ্জাক এমপি প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার শুভেচ্ছা। তিনি মার্কিন কর্মকর্তা, সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের সাথেও মোলাকাত করেছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদীদের তৎপরতা সম্পর্কে তিনি তাদের সাথে আলোচনা করেছেন।” [হাফিজ মকবুল হোসেন, বিশ্বসভায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও মেঠো ইঁদুরের ছোটাছুটি, সপ্তাহিক বিক্রম, ১১—১৭ অক্টোবর ’৯৩ সংখ্যা]
সম্পাদক: মিলন খান মোবাইল +৮৮০১৮৩০-৩০৩১৩১ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আব্দুল জব্বার মোবাইল +৮৮০১৭২২-৩৬৩৪০৪ বার্তা সম্পাদক: রাকিব ফেরদৌস মোবাইল +৮৮০১৮৬১-৬৫৮৮৭৫
বানিজ্যিক কার্যালয়: রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও, বাংলাদেশ।